আজকের দিনটা আমার জন্য একটু চাঞ্চল্যপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আজকে আমার প্রতীক্ষার অনেক আগেই আমি একটা খবর পেলাম।
আসলে আমি হঠাৎ করেই এই বছরের শুরুর দিকে ডিসিশন নিয়েছিলাম যে আমি সপরিবারে কানাডা চলে যাবো। কারণটা অবশ্যই ব্যতিক্রম অন্য সবার থেকে। সেটা হচ্ছে আমার একমাত্র ছেলে। ওর অটিজমের সমস্যা রয়েছে। যদিওবা আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ আর স্বাভাবিক হয়ে যাবে যদি আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করি এবং আমি আর আমার স্ত্রী সেটা করেও চলেছি।
তবে আমি ধারনা করি যে ও অন্যদের তুলনায় অনেক সাধাসিধা প্রকৃতির হবে যার কারণে বাংলাদেশে ওর বেড়ে ওঠা আর টিকে থাকাটা অনেকটাই কঠিন হয়ে যাবে। শুধু ওর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই ডিসিশন নিলাম যে আমি সপরিবারে কানাডা চলে যাবো।
আমার জন্য ডিসিশনটা নেয়া অবশ্যই অনেক কঠিন ছিলো। আমি জীবনে কোনদিনই চাইনি দেশের বাইরে গিয়ে পার্মানেন্টলি সেটল করে যাওয়ার। বিদেশের ব্যাপারে আমার বরাবরই অনীহা ছিলো। আল্লাহ আমাকে যেপরিমানে রুটি রুজির ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন, আমি তাতে করে দেশের মাটিতে রাজার হালেই চলতে পারি, আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু শুধু আমার ছেলের কারনেই আমাকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
যাহোক, এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটা এজেন্সির সাথে এগ্রিমেন্ট সাইন করে ফেললাম, বিজনেস স্টার্টআপ প্রোগ্রাম।
অন্যান্য অনেক প্রোগ্রাম ছিলো যেগুলোর খরচ অনেক কম, কিন্তু সেগুলোতে একটু হলেও অনিশ্চয়তা ছিলো। কিন্তু এটাতে মোটামুটি ৯০% শিওর যে ইমিগ্রেশন হয়ে যাবে। এই প্রোগ্রামটা অনেকটা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি কিনে নেয়ার মত। এজন্য খরচও অনেক বেশি।
এই প্রোগ্রামের জন্য আমাকে খরচ করতে হবে দুই লক্ষ্ কানাডিয়ান ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকার সমান।
সারাজীবনের সমস্ত জমিয়ে রাখা টাকা এই চলে যাওয়ার জন্য খরচ করব ভেবে আল্লাহর উপরে ভরসা করে ডিসিশন নিলাম যে এই প্রোগ্রামেই আমি যাবো। আল্লাহ যদি কপালে লেখেন, তাহলে আমি আবার আয় রোজগার করে এই টাকা জোগাড় করে ফেলতে পারবো, ইনশাল্লাহ - এই ভেবেই রিস্কটা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
যাহোক, সমস্ত কাগজপত্র তৈরী করে জুনের ১৪ তারিখে এ্যাপ্লিকেশন জমা দিলাম IRCC Portal-এ।
করোনার কারনে ২ বছরের এ্যাপ্লিকেশন প্রসেস করতে না পারার কারনে এ্যাপ্লিকেশনের একটা বিরাট চাপ আছে। আমার এই প্রোগ্রামে নাকি আগে ৮ মাসের মধ্যে PR হয়ে যেতো, কিন্তু এখন নাকি ১৬ থেকে ১৮ মাস লেগে যায়। আমি মনে মনে তৈরিই ছিলাম এজন্য। তবে আগে ভাবে চলে যেতে পারলে অবশ্যই ভালো কারণ তাতে করে আমার মেয়েদের পড়াশুনার বছর লস কম হবে।
তারপরেও যদি দেরী হয়, এই ভেবে মনে মনে নিজেকে তৈরী করেছি যে আমি ২০২৫ সাল নাগাদ পাড়ি জমাবো কানাডাতে।
হিসাব মতে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আশা করেছিলাম আমার ফাইল নাম্বার পাবো, কিন্তু আজকে হঠাৎ করেই খবর পেলাম যে আমার আর আমার এক পার্টনারের ফাইল নাম্বার চলে এসেছে। হিসাবে প্রায় ২ মাস আগেই এসেছে।
আসলে ২০২২ সালের নভেম্বর মাস থেকে কানাডা সরকার অনলাইনে এ্যাপ্লিকেশন নেয়া শুরু করেছে ওদেরও নতুন ইমিগ্রান্ট নেয়ার একটা তাড়া আছে, যার কারনে ওরা খুব তাড়াহুড়ো করেই এই অনলাইন ভিত্তিক এ্যাপ্লিকেশন সিস্টেমটা চালু করেছে।
আমি এ্যাপ্লিকেশন জুন মাসে সাবমিট করার পর প্রতি মাসেই খবর নিতাম এজেন্সির কাছে যে ওদের আগের এ্যাল্পিকেশনগুলো কেমনভাবে আগাচ্ছে। অক্টোবরে এসে শুনলাম ওদের ২০২২ সালে এপ্রিলের এ্যাপ্লিকেশনের ফাইল নাম্বার পাওয়া শুরু হয়েছে। সেইহিসেবে ভাবলাম আমাদের হয়ত ২০২৮ এর মার্চ বা এপ্রিলের দিকে ফাইল নাম্বার পাবো।
এজেন্সির সাথে কথা বলার পর বল্লো যে অনলাইনের এ্যাপ্লিকেশন গুলো যদি ওরা প্রসেস করে ফাইল নাম্বার দেয়া শুরু করে তাহলে বেশী দেরী হবে না। কিন্তু আমার পার্টনার ফ্যামিলিগুলোর যাওয়ার একটু বেশী তাড়া ছিলো কারণ ওদের বাচ্চাদের বয়স বেশি। তিনটা বাচ্চা এই বছর এস এস সি পাস করলো। ২০২৪ এর মে জুনের মধ্যে না যেতে পারলে ওদের ওই বছরের কলেজ সেশন মিস হবে। কারণ কানাডাতে স্কুল কলেজের সেশন সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়।
এজন্য আমার পার্টনার ফ্যামিলি এ্যাপ্লিকেন্টরা আমার সাথে গত পরশু রাতে আমাকে ফোন করে পরামর্শ করলো যে আমাদের একটু আগে ভাবে চলে যাওয়ার ব্যাবাস্থা করতে হবে। এজন্য আমরা ডিসিশন নিলাম যে এজেন্সির সাথে কথা বলব যে যদি ডিসেম্বরের মধ্যে যদি আমাদের ফাইল নাম্বার না আসে, তাহলে আমরা ওয়ার্ক পারমিটের জন্য এ্যাপ্লাই করব জানুয়ারি মাসে।
কথামত গতকাল রাতেই আমরা সবাই মিলে এজেন্সির আশরাফ ভাইয়ের সাথে জুমে মিট করে অনেকক্ষণ কথা বললাম। ওভাবেই ডিসিশন হলো যে যদি ডিসেম্বরের মধ্যে আমাদের ফাইল নাম্বার না আসে তাহলে জানুয়ারীতে আমরা সবাই ওয়ার্ক পারমিটের জন্য এ্যাপ্লাই করব।
কিন্তু আল্লাহর কি অশেষ রহমত যে পরদিন সকালেই আমি খবর পেলাম যে আমার আর মিলন ভাই (আমার আরেকজন পার্টনার যে ফ্যামিলিসহ এ্যাপ্লাই করছে) এর ফাইল নাম্বার চলে এসেছে। আল্লাহর কাছে আমার এজন্য কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এখন কেমন যেন মনে মনে একটু আশা করতে ইচ্ছে করছে যে হয়ত ২০২৪ সালের জুন জুলাই মাসের মধ্যে হয়ত আমি সপরিবারে চলে যেতে পারব।

0 Comments